তোমার জন্য কেন এত কান্না আসে বলো তো?
এগিয়ে যাওয়া জীবনের ধর্ম, এতো সহজ সত্য। কিন্তু সর্বস্ব দিয়ে ভালোবাসা মানুষটাকে ছেড়ে এগিয়ে যাওয়া ভীষন কঠিন। যেন কত সহজে একটি ফুল টুপ করে ঝরে যায়। দেখে মনে হয়, কত সহজ ফুলের ঝরে যাওয়া। এমন কত ফুলই তো ঝরে যায় প্রতিদিন, কত নতুন কুঁড়ি প্রস্ফুটিত হয় নতুন ফুল হয়ে। কিন্তু একটা ঝরে যাওয়া ফুলই জানে, যে কান্ডটি তাকে ধরে রেখেছিল অসীম যত্নে, মমতায় – তাকে ছেড়ে ঝরে যাওয়া কী কষ্টের। ঐ স্থানে আবার নতুন জীবনের স্পন্দন সৃষ্টি হয় ঠিকই, কিন্তু মর্মে একটা নিবিড় আঘাত অবিরাম বেদনা দিয়ে যায়।
আমার তোমাকে খুব দরকার ছিল জীবনে। আমার জীবন সঠিক পথে পরিচালনা করার জন্য, আমি জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পড়লে আমাকে আবার জাগিয়ে তোলার জন্য। এই পৃথিবীতে কেউ আর পারবে না আমার স্বরূপ বুঝতে, আমি কে বুঝতে, আমি কী চাই বুঝতে – সে শুধু তুমি পেরেছ, তুমিই পারতে। আমি জানি, আমি পারতাম তোমায় প্রতিদিন নতুন করে গড়ে তুলতে, তুমি যেমন করে চাও তোমাকে কেউ বুঝুক, তোমাকে ঠিক সেইভাবে বুঝতে। আমাকে এবার এগোতে হবে নিজের মনের শক্তিতে, কিন্তু মনও তো মাঝে মাঝে বলবে আর পারছি না। তখন আমার তোমার কথা মনে পড়বে। মনে হবে, তুমি থাকলে, আমার এই ক্লান্তি এক নিমেষে দূর হয়ে যেত তোমার কোলে একবার মাথা রাখলে। জানো, সব মেয়ের কোলেই সব শিশুর কান্না থামে না, তার চাই তার মায়ের কোল। সব কোলই এক, সেখানে মাথা রেখে শোয়া যায়। কিন্তু সব কোলই শান্তি দিতে পারে না, শুধু মানুষটাকে বুঝতে পারার অভাবে। তুমি আমার সে ছিলে।
আমি জীবনে অনেকবার ভেঙে গেছি। আমি নিজেই উঠে দাঁড়িয়েছি, আমি চেষ্টা করেছি সব ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার। আমি যখন খুব ক্লান্ত হয়ে পিপাসার জল খুঁজেছি, তখন ঘোলা জলকেই আমার উপাদেয় পানীয় বলে মনে হয়েছে। আমি অপেক্ষা করতে পারিনি, স্বচ্ছ-পরিচ্ছন্ন পানীয় খোঁজার। তার ফলস্বরূপ আমি রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। আজ তোমাকে সামনে পেয়েও তাই অসহায়ের মতো চলে যেতে দেখতে হচ্ছে।
দুজনে জীবনের এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন দুজনের দুজনকে সবথেকে বেশি দরকার ছিল, অন্তত আমার মনে হয়। যেন নিরুপায় হয়ে আজ অন্য পথে চলে যেতে হচ্ছে তোমায়, আমি অসহায় হয়ে দেখছি তাকিয়ে, তুমি কেমন করে চলে যাচ্ছো অন্যের কাছে। তোমার তো কোনো দোষ ছিল না, তোমার তো কোনো বাধা ছিল না। সমাজের এক নিদারুন নিয়মের প্রাচীরে বারবার ধাক্কা খেয়ে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত হওয়ার পরেও, শুধু একটা বিষাক্ত ঝড়ে তোমায় লণ্ডভণ্ড করে দিতে চাইলাম না বলেই, আমি নীরবে সব দেখে গেলাম। আমি সব ঝড় সামলে তোমাকে নিজের কাছে করে নিতে পারতাম, কিন্তু সত্যি তুমি পারতে না। একটা নিষ্পাপ ফুলকে ঝরিয়ে ফেলার পাপের থেকে তুমি জীবনে অন্তত একটা শান্তির সংসারে থাকবে, তাই ভালো নয় কি?
তুমি তো আমার প্রেমিকা নও শুধু, আমার প্রানের স্পন্দন। আমার প্রতিদিনের বাঁচা ছিল তোমায় ঘিরে। আমাকে কেউ যদি এই পৃথিবীর সবথেকে মূল্যবান জিনিস যার মূল্য হয়তো কয়েক কোটি টাকা, আর তোমার মধ্যে যে কোনো একটিকে বেছে নিতে বলে – আমি তোমায় বাছব। আমি আমার শক্ত পায়ে, বুকে হাত রেখে, চিৎকার করে বলতে পারি – আমি তোমায় নেব। তুমি আমার পাশে থাকলে, সব মহার্ঘ্য বস্তু আমার হত। ধমনীর অনেক রক্তক্ষরনের মধ্য দিয়ে তোমার ভালোবাসা, মায়া, মমতা পেয়েছি আমি। আমি জীবনে কোনোদিন তোমায় অসম্মানিত করতে পারব না।
তাকে কি বিরতির পরের মিলনের কঠিন, কঠোর অপেক্ষায় হারাতে ভালো লাগে? তাই নিরন্তর কেঁদে চলি আমি, আপনিই আমার ভিতর থেকে যন্ত্রনা উথলে ওঠে। যতই বলো, চেষ্টা করো জীবনের পথে স্বাভাবিক ভাবে চলার, আমি জানি আমার পক্ষে সেই কাজ কী ভীষন কঠিন। এই পৃথিবীতে অসম্ভব কিছু নয়। পারতে পারতে মানুষ ঠিক পারে। আবার ভাগ্য চাইলে মিলিয়েও দেয় একদিন। সে দিনের জন্যই বাঁচা। বাঁচো তুমি, বাঁচি আমি।
দুটো মানুষের মন যেন ঠিক খাপে খাপে মিলে যায়, একে অপরের ঠিক পরিপূরক। তবু তারা দূরে চলে গেল, মিলল না। বিধাতা চায়নি, মেলেনি। আবার বিধাতা চাইলে, আর পরস্পরের বিশ্বাস অটুট থাকলে সব হয়।