ভীষন ভালোবাসতাম তোমায়। তোমার সাথে কথা বলার জন্য পাগলের মতো বৃষ্টি বাদলে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেরিয়েছি। প্রচন্ড শীতে ইচ্ছে করেনি ঘরে লেপের আরামে বসে থাকতে, কারন তোমাকে না পেলে আমার চলত না। তুমিই আমার আরাম ছিলে। এ আমার হিসেব কষা নয়। এ আমার অহংকার তোমাকে এমনভাবে ভালোবাসার। সেই সময়ে যেমন তুমি আমাকে ভালোবেসে কথা বলেছ, তেমনি নিষ্ঠুরভাবে উপেক্ষাও করেছ বারবার। তোমার উপেক্ষায় আমার ভিতরটা যন্ত্রনায় অস্থির হয়ে যেত। অভিমানে কাতর হয়ে অভিযোগে অস্থির করে তুলতাম তোমায়। তবু আমি জানতাম যে আমি এক অসময়ে তোমাকে ভালোবাসতে এসেছি, তাই ভিতরের সংকোচ, দ্বিধা থেকে এইভাবে উপেক্ষা করো তুমি। নিজেকে বোঝাতাম। তুমি আমার কাছে ভীষন দামি ছিলে, যাকে বছরের পর বছর সামনে থেকে দেখে, বুঝে, বিশ্লেষন করে ভালোবেসেছি। এমন অন্তর আমি কখনো দেখিনি। ভেবেছিলাম, তোমার ভালোবাসা পাওয়া বোধহয় খুব কঠিন এক তপস্যা। এক দেবীর মতো মন থেকে উপাসনা করে, তপস্যার মতো সাধনা করে তোমার ভালোবাসা পেতে চেয়েছি। তোমাকে এতটা অনুভূতিপ্রবন দেখেছিলাম যে তোমার মধ্যে গভীর হৃদয়ের সন্ধান পেয়েছিলাম। আমি ভাবিনি যে, অসময়ে এসেছি বলেই আমাকে এত কষ্ট করে ভালোবাসা পেতে হচ্ছে। বরং ভেবেছি, তোমার মতো মেয়ের ভালোবাসা পাওয়া যে কোনো সময়েই, কোনো পুরুষের কাছে এক সাধনার বিষয়। তোমাকে শুধু ভালোবাসলেই হয় না, যত্ন করতে হয়, সব আঘাত থেকে পরম মমতায় আগলে রাখতে হয়। তোমাকে ভালোবাসলে উপেক্ষা করা যায় না, কারন তোমাকে একটু ভালোবাসলে তুমি তার বহুগুন ভালোবাসা ফিরিয়ে দাও। এত ভালোবাসার মধ্যেও জানতাম একদিন তোমাকে আমাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে। আমি অন্তর থেকে তোমাকে একেবারে নিজের করে নিতে চাইলেও পরিস্থিতির জটিলতায় তা হয়তো একেবারেই সুখকর হত না। আমি ভেবেছিলাম যখন সেইদিন আসবে, দুজনের খুব কষ্ট হবে। আমি যেমন ভেঙে পড়ব, তুমি তেমনি আমাকে হারানোর ব্যথায় ভেঙে না পড়লেও কাতর হয়ে পড়বে। কিন্তু আমি কি ভুল ছিলাম!
যেদিন তোমার সঙ্গে অন্য কারো কথা বলার দিন এলো, আমাকে সেই সকালেই শুনতে হল – “আমি মন থেকে তোমাকে সরানোর চেষ্টা তো করছি, সমান্তরাল ভাবে কিছু করা তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।” আমি সেদিন অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ভাবলাম, কেউ আসতে না আসতেই মন থেকে সরানোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়, নাকি কেউ পারে? কত ভালোবাসায় দুজনের মিলন হয় না, তবু তারা একে অপরকে ছেড়ে যাওয়ার যন্ত্রনায় কান্নায় ভেঙে পড়ে প্রতিনিয়ত, যদি দুজনেই দুজনকে ততটাই ভালোবাসে। সেদিন বুঝেছিলাম, মায়া হলেও তেমন করে ভালোবাসোনি। তোমার সামনে যেমন তোমার সুনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতছানি ছিল, তেমনি আমার ভালোবাসা-কথা হারানোর ভয় থাকাও স্বাভাবিক ছিল। আমি ভেবেছিলাম, নতুন একটা সম্পর্ক গড়তে সময় লাগবে, তার প্রতি অনুভূতি, অভিমান, অভিযোগ আসতে সময় লাগবে – যখন তোমাকে আমি আমার হৃদয়ের সবটুকু উজাড় করে ভালোবেসেছি। তুমি তা শুধু আমার মুখের কথায় দেখোনি, আমার পাগলের মতো ছটফটানিতে দেখেছ, যন্ত্রনায় দেখেছ।
আমি দেখলাম খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তোমার সাথে অন্যজনের ঘন্টার পর ঘন্টা কথা শুরু হল। মাত্র একদিনেই আমাকে “ভালোবাসি” বলা বন্ধ হয়ে গেল। যে মিষ্টি “সোনা” ডাকে আমার মনটা গলে যায় জানতে, তা কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল। আমার সময়, কথা সব এক অদ্ভুত অলৌকিক বলে দুইদিনেই অন্য কারো হয়ে গেল, যে তখন ভবিষ্যতের সঙ্গী হওয়া দূরের কথা, “হবু” বলার মতো মানুষও হয়নি। দুইদিন পরেই দেখলাম তুমি বলছ – “যে বুঝে যায় কাউকে পেয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে, সে ঠিক অবহেলা করতে শুরু করে।” বুঝলাম, শুধু কথাই নয়, তার প্রতি তোমার অভিমানও শুরু হয়ে গেছে সে একটু কথা না বললে। তোমার চোখে কান্নাও দেখলাম তার জন্য। আমি ভাবলাম, এই কথা শুরু হল, এর মধ্যে উপেক্ষাও শুরু হয়ে গেল! আমি জানতাম, তোমার একার জীবন এমন এক সময়ে এসে দাঁড়িয়েছে, একজন ভালো মানুষের সাথে ভবিষ্যৎ গড়লে তুমি শান্ত হবে, সুস্থির জীবন পাবে। কিন্তু সেই মানুষটিকে চেনার জন্য, জানার জন্য, বোঝার জন্যও কি সময় লাগে না?
আমি শুনলাম তোমাকে নতুন সঙ্গী এক সপ্তাহের মধ্যেই বলছে, “তুমি দেখো, আমার জন্য কাঁদবে তুমি।” কিংবা “আমার কপালে তুমিই লেখা আছো”। আমি যন্ত্রনায় কাতর হলেও খুশি হতাম এই ভেবে যে এবার তোমার সুদিন আসছে বোধহয়। সে কত সহজে মিশে যেতে পারে, সে কত তোমার কথা শোনে, তার সাথে বিয়ে হলে তুমি থাকতে পারবে – তোমার মুখে একটা স্বল্প অবিশ্বাস মিশ্রিত সুরে শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল – ঠিক সময়ে একটা সম্পর্ক কত তাড়াতাড়ি সহজ হয়ে যেতে পারে। আমি তো অসময়ের, তাই আমাকে কত কষ্ট পেতে হয়েছে ভালোবাসা পাওয়ার জন্য। এরপর থেকে তার উপেক্ষা, তোমার যন্ত্রনা, মান-অভিমান, মান-অভিমানের অবসান হয়ে আবার কথা শুরু – এসব আমার অভ্যাস হয়ে গেল। বুঝতাম, এ ওদের নিতান্তই নিজস্ব সম্পর্কের ওঠানামা। আচ্ছা কোনো নতুন সম্পর্কে এত তাড়াতাড়ি এত ওঠানামা থাকে? জানি না।
আমি তোমায় দেখার জন্য কত কাতর অনুরোধ করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছি বারবার। আর অন্যজন কত তাড়াতাড়ি, “আমায় একটু দেখতে ইচ্ছে করে না”, বলে ঘন্টার কাছাকাছি ভিডিও কলের সুযোগ পেয়ে যায়। সময় কত মধুর ! অথচ তার দুইদিন আগেই শুনছিলাম, সে নাকি চরম উপেক্ষা করছে তোমাকে। কেউ বারবার উপেক্ষা করছে, আবার তারপরেই একটু বুঝিয়ে মন গলিয়ে দিতে পারছে, এ তখনই সম্ভব যখন অপরজন তাকে জীবনে পাওয়ার জন্য কাতর হয়ে উঠেছে। একজন পুরুষ তখনই এক নারীর ভালোবাসা পেয়ে যায়, যখন সেই নারী তার জন্য চোখের জল ফেলে।
আমার খুব কষ্ট হত, আমার খুব আনন্দ হত – তুমি কত তাড়াতাড়ি একজনের অনুভূতির অংশ হয়ে গেলে, কেউ একজন কত তাড়াতাড়ি তোমার অনুভূতির অংশ হয়ে উঠল। আমি অবাক হয়ে ভাবি, কত তাড়াতাড়ি দুজন দুজনকে বুঝে গেল! মনে মনে বলতাম, আবার মুখেও বলতাম তোমাকে – “তোমার জীবন অনেক সুন্দর হোক”।
এই গতকালই শুনলাম, সে নাকি সকালে পরে কল করছি বলে আর কল করেনি সারাদিন। তুমি কাঁদছিলে তার উপেক্ষায়। আচ্ছা বলো তো, মানুষ মানুষকে ভালোবাসলে খবর না নিয়ে থাকতে পারে? আমি তো রাগ হলেও কয়েক ঘন্টার বেশি থাকতে পারিনি তোমার সাথে কথা না বলে। তুমিও পারোনি। কেউ তখনই তাকে উপেক্ষা করে যাকে সে সস্তা ভেবে নেয়, যখন বুঝে যায় সে ছাড়া তার চলবে না, যখন জেনে যায় তাকে আবার সহজেই দুটো কথা বলে ফিরিয়ে নেওয়া যায়, যখন বুঝতে পারে সে তার উপর নির্ভর করতে শুরু করেছে। যখনই কারো মনে এই নিশ্চয়তাটুকু আসে, সে ভালোবাসতে ভুলে যায়। আমি তোমায় ভীষন দামি ভেবেছিলাম, আসলে জীবনের এই সময়ে দাঁড়িয়ে তুমি ও তোমার অনুভূতি ভীষনই সস্তা হয়ে গেছে। এখন যে কেউই তোমাকে সহজে পেয়ে যেতে পারে। অথচ ভীষন দামি তুমি, আমি জানি।
আমি তোমাকে যত দেখি, আমি প্রতিদিন বিষ্ময়ে পড়ে যাই। আমার কাছে তুমি একটা শুধু মেয়ে নও, তুমি একটা নারীমন সংক্রান্ত বিরাট বই, বিশাল মহাকাব্য। তুমি কি জীবনে তাদের জন্যই চোখের জল ফেলেছ, যারা তোমাকে ভালোবাসা দেখিয়ে উপেক্ষা করেছে! তুমি কি জানো না, ভালোবাসলে অভিমান আসে, রাগ আসে, অভিযোগ আসে – উপেক্ষা আসে না? যে নারীকে কোনো পুরুষ ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে প্রানপনে উপেক্ষা করেছে, সেই নারী সেই পুরুষের জন্যই তত ব্যাকুল হয়েছে, তত মরেছে, তত যন্ত্রনায় কাতর হয়ে পড়েছে। সব নারী তা করে না, সেই করে যে ভালোবাসতে জানে, কিন্তু প্রকৃত ভালোবাসা চিনতে পারে না। আমি ব্যক্তিগত চর্চা প্রেমী নই। কিন্তু তোমার জীবন আমার কাছে এক রহস্য, তাই আমি বারবার ফিরে যাই সেখানে। তুমি অতীতে যাকে ভালোবাসতে, সেও তোমাকে নাকি ভীষন উপেক্ষা করেছে। তুমি তাকে কত চাইতে, অথচ সে নাকি তুমি বাড়ি ফেরার পর কখনো ফোন করে খবর নেয়নি, তোমার দুঃসময়ে খবরও নেয়নি। আমি হয়তো তেমন করে তোমাকে উপেক্ষা করতে পারিনি, আমার সেই বিলাসিতার সুযোগ ছিল না, তাই তোমাকে আমার কাছ থেকে উপেক্ষার কষ্টও পেতে হয়নি। এ আমার গর্ব। আমি যাকে ভালোবেসেছি, তাকে একদিনের জন্যও উপেক্ষা করিনি, তাই সে আমাকে ভালোবাসার যন্ত্রনাও বোঝেনি। যন্ত্রনা না দিলে বুঝি ভালোবাসা হয় না! যন্ত্রনা না দিলে বুঝি বিচ্ছেদেও যন্ত্রনা হয় না?
সেই অতীতের মানুষটার প্রতি তোমার এখন নাকি কোনো অনুভূতি নেই। কেন নেই? কারন, সে নাকি এখন সংসারী মানুষ। আমি তোমায় জিজ্ঞাসা করলাম, “আজ যদি সংসারী না হত?” তোমার উত্তর এলো – “তখন অবশ্যই ভেবে দেখা যেত”। তোমার এই উত্তরটি আমাকে চমকিত করে দিল। আমি ভাবছি, মানুষ সম্পর্কে তোমার মূল্যায়ন কী? তুমি কোনো মানুষের তোমার প্রতি ব্যবহার, আচরন এগুলো কোন চোখে দেখো? কোনো মানুষকে যদি তার নিষ্ঠুর উপেক্ষার জন্য ছেড়ে আসা যায়, তাহলে আবার তাকে গ্রহন করার সম্ভাবনা থাকে যদি সে বিবাহিত না হয়! মানুষের সম্পর্কে মূল্যায়ন আর অনুভূতি কি বিবাহিত আর অবিবাহিত অনুযায়ী বদলে যায়? অপশন নেই বলে ইন্টারেস্ট নেই, অপশন থাকলে ইন্টারেস্ট থাকত – এ তো বড়ো জটিল বিষয়। তাহলে কি মানুষটা ভুল ছিল না, তুমিই ভুল ছিলে? তাই কি এখনও তার বিবাহিত ও অবিবাহিত অবস্থা দিয়ে তার প্রতি অনুভূতি মূল্যায়ন করতে হয়?
আমার চোখে যে খারাপ হয়েছে, সে চিরদিনের জন্য খারাপ হয়েছে। তাকে ঘৃনা আমি করি না, তাকে উপেক্ষাও আমি করি না, আমি তাকে জীবন থেকে মুছে দিই। সে কোনো অপশন থাকে না আর। যে একবার উপেক্ষা করে সে ভুল করে। যে দুইবার উপেক্ষা করে সে অন্যায় করে। যে বারবার উপেক্ষা করে সে অপরাধ করে। তার জন্য এই মনের কোনো স্থানে কোনোদিন এক বিন্দুসমান জায়গাও আমার নেই। যে সুযোগ থাকতেও, পেয়েও উপেক্ষা করেছে বারবার, সে আসলে ভালোবাসেনি। সে নিজের কাজ করেছে, সময় পেলে কাছে এসেছে, হয়তো গ্যারান্টেড ভেবেছে, পরে নিজের গিল্ট দূর করতে কাছে আসার চেষ্টা করেছে। পুরুষ তার সত্যিকার ভালোবাসার নারীকে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যায়, তাকে এতটাই যত্ন করে যে সেই পুরুষ সঙ্গ কোনো নারীর স্বর্গসুখ বলে মনে হয়। চলার পথে অনেক সময় চোখের জল মানুষ চিনতে ভুল হলেও ঝরে, তাকে আমরা প্রেম বলি হয়তো। প্রেম বিরহে হয়, উপেক্ষায় নয়। এই পৃথিবীতে যত ভালোবাসার মহাকাব্য রচিত হয়েছে, সেগুলো পড়লে দেখা যায় কেউ কখনো কোনোদিন কাউকে উপেক্ষা করেনি, তারা বিরহ যন্ত্রনায় কাতর হয়েছে, দূরত্বে কাতর হয়েছে।
যে এক নিমেষে একটা পুরুষের ভালোবাসার কথা থেকে অন্য পুরুষের ভালোবাসার কথায় হারিয়ে যায়, সে আসলে প্রথম পুরুষটিকে ভালোইবাসেনি। মায়া করতে পারে, যত্ন করতে পারে, ভালোবাসেনি। হয়তো তার প্রতি করুনা হয়, কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে কাতর হয় না। কারন যাই হোক, সময় অসময় যাই হোক, দুই বছরের একটা সম্পর্ককে কেউ একদিনে মন থেকে সরানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করতে পারে না। এগিয়ে যেতে পারে। সেটা ধীরে ধীরে হয়, সময়ের সঙ্গে হয়, হঠাৎ করে হয় না।
একজন নাকি তোমায় পাওয়ার জন্য কত কী করেছে, তোমাকে খুঁজে বেরিয়েছে – সেই কথা শুনে তুমিও ভালোবাসায় পড়ে গেছ। তার একবেলার নীরবতা তোমার কাছে বিষম হয়ে পড়ছে, তুমি কাঁদছ, তুমি অপেক্ষা করছ। পরে এসে ভুলিয়ে দিলে ভুলেও যাচ্ছো। তুমি কেমন যেন পাত্র হাতে বসে আছো, হঠাৎ পরিচিত, নতুন কারো কাছে দিন পাওয়ার জন্য, গুরুত্ব পাওয়ার জন্য। তোমায় যদি সে চায়, তোমার পাত্র নিশ্চয় পূর্ন করে দেবে। সব উপেক্ষা পেরিয়ে একদিন গর্ব করে তুমি তোমার সঙ্গীর সাথে সংসার করো, এটাই মন থেকে প্রার্থনা।
শুধু তোমায় অনুরোধ জানাই, কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে কারো কাছে উপেক্ষনীয় করে তুলো না। আর অপশন দিয়ে মানুষ বিচার কোরো না। আমার সব ধারনা, তত্ত্ব ভুল হোক। তুমি মন থেকে যা চাও, তাই যেন পাও।