গুরুত্ব

কারো জীবনে আমরা কোনো নামের সম্পর্ক হতে পারি বা না পারি, গুরুত্বপূর্ণ হওয়া খুব জরুরি। জীবনে যাকে স্ত্রী বা স্বামী হিসেবে পাওয়া যায়, তার গুরুত্ব হল – জীবনে তাকে দিয়ে মানুষের শারীরিক চাহিদা বা মানসিক চাহিদা পূরন হয়, সে পাশে থেকে প্রাত্যাহিক সুখ দুঃখের অংশীদার হয়, একা পথ চলার ভার লাঘব করে। প্রেমিকা-প্রেমিক পরস্পরের মনের আকর্ষনে একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে। ভালোবাসা গভীর হলে বিচ্ছেদের বহু বছর পরেও তার স্মৃতিচারনা হয়।

যে মানুষটা সংসারের সমস্ত দায়িত্ব মাথা তুলে নেয়, কোনো কাজে সে না থাকলে তার কথা উঠে আসে, ভালোবাসায় নয়, গুরুত্বে। বাড়ির কাজের লোকটা না এলে সকাল থেকে তার অনুপস্থিতি টের পাওয়া যায় ভালোবাসায় নয়, গুরুত্বে। যেদিন পায়ের জুতোটা ছিঁড়ে যায়, একটা মুচির গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। ঝাড়ুদারের চাকরি কেউ করতে চায় না, কিন্তু রেলস্টেশনটা নোংরা হলে তারই কথা মনে পড়ে, খুব পরিষ্কার থাকলেও তাকে একবার মনে মনেও ধন্যবাদ দেওয়া হয়।

রাতের অন্ধকারের গুরুত্ব নিদ্রার জন্য। দিনের আলোর গুরুত্ব কাজ করে অর্থ উপার্জনের জন্য, গাছের খাবার তৈরির জন্য, এই জীবজগৎ বাঁচিয়ে রাখার জন্য। উষার গুরুত্ব নতুন দিনের আশার জন্য।

গোধুলির গুরুত্ব? যদি সে আকাশে রঙের খেলা নিয়ে আসে, সাময়িকভাবে মন তার প্রেমে পড়ে যায়। কিন্তু বেশির ভাগ দিনই সে নীরবে চলে যায় দিন থেকে রাতের কোলে।

যাকে মানুষ ভালোবাসে সেই মানুষটাও যে তাকে ভালোবাসবে তার তো কথা নেই। মানুষ অন্য পক্ষের ভালোবাসা তখনই পায়, যখন সে অন্য পক্ষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয় কোনো না কোনো ভাবে।

মানুষ যে মানুষকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে ভবিষ্যতের, সেই মানুষই অন্যজনের কাছে গুরুত্ব পেতে শুরু করে। তখন দুইদিনের পরিচয়েই কারো অভাব অনুভব হয়, কারো উপর অভিমান হয়, কারো সামান্য উপেক্ষাতেও মন বিষন্ন হয়। অপরদিকে যে মানুষটা বুকভরা ভালোবেসেও অন্যজনের ভবিষ্যতের আশা হতে পারে না, তার ভালোবাসা অন্যজন জানতে পারলেও তাকে তার অনুভূতির অংশ করে না। সেই মানুষটা তার চোখের সামনে কিংবা দৈনন্দিন সংলাপে থাকল কি থাকল না, তাতে কিছু এসে যায় না। কারন সে অন্যের গুরুত্ব পায়নি।

গুরুত্ব থাকলে কারো হাজার অবহেলাতেও কেউ নিজেকে নিঃশেষ করে দেয় মানসিক যন্ত্রনায় বিদ্ধ হয়ে। যে তার অন্ধকার সময়ে খবরও নেয়নি, যে তার দৈহিক যন্ত্রনার সময়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, যে তার গুরুত্ব পাওয়ার ছটফটানি দেখেও উপেক্ষা করে গেছে – সেই তথাকথিত ভালোবাসার মানুষটাও ভালো সময়ে ভালো কথা বলে তার কথা ফিরে পেয়ে যায়, শুধু একসময় একজনের কাছে তার গুরুত্ব ছিল বলে, তাকে একজন ভালোবাসত বলে। তখন সে সারাজীবন অন্তরে রাখার কথা দিয়ে যায়। সেই কথায় অন্যজন অন্যভাবে ভালোবাসার প্রত্যাবর্তনের অনুভূতিতে গলিত হয়।

ভালোবাসার কোনো সময় হয় না, ভালোবাসা হয় গুরুত্বে। একজনের অনুভূতির অংশ হওয়ার গুরুত্ব, একজনের ভালো লাগার গুরুত্ব, একজনের মনের মতো কথা বলার সঙ্গী হতে পারার গুরুত্ব, একজনের ভবিষ্যতের স্বপ্নের সাথী হওয়ার গুরুত্ব, একজনের “আইডেন্টিটি” হওয়ার গুরুত্ব।

যে মানুষের কারো কাছে গুরুত্ব নেই, সে যতই পাশে থাকার চেষ্টা করুক, যতই ভালো-খারাপের সাথী হওয়ার চেষ্টা করুক, যতই কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই অন্যের ভালোর জন্য নিজের ভালোবাসাকে উৎসর্গ করে তীব্র মানসিক যন্ত্রনায় দিনযাপন করতে করতেও তার খবর নিতে আসুক – সে একদিন শুনবে – তার সাথে কথা হল কি না হল, তাতে অন্যজনের কিছু এসে যায় না!

গুরুত্ব অমূল্য!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *