রাস্তা

যে রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গেছে গ্রাম্যক্ষেতের বুক চিড়ে, সেই রাস্তা আমার কাছে কখনো পুরোনো হয় না। তবু সে আমার কাছে তেমন ছিল না, আজ সে যেমন হয়ে উঠেছে। বহুবছর ধরে সেই রাস্তা ছিল আমার কাছে হেঁটে যাওয়ার পথ, একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাওয়ার পথ, যেমন সে ছিল আরো হাজার হাজার মানুষের কাছে। তার পাশের জমি ছিল নিতান্ত সাধারন ভুখন্ড, তার পাশের গাছ ছিল নিতান্তই প্রকৃতির সন্তান, তার উপরের আকাশ ছিল নিতান্তই এক সাধারন আকাশ।

তারপর তুমি এলে!

ঐ রাস্তা দিয়ে এক মুঠোফোন নিয়ে হেঁটে গেছি তারপর মাসের পর মাস। প্রতি পদক্ষেপে একের পর এক বার্তায় তোমার মাঝে মিশে থাকতাম আমি। আমি ভুলে যেতাম আমি ঐ রাস্তায় হাঁটছি যার পাশে গাছ আছে, ধানক্ষেত আছে। ভুলে যেতাম আমার মাথার উপরের ঐ আকাশের বুক জুড়ে অসংখ্য নক্ষত্র আছে। শুধু পশ্চিম আকাশের ঐ উজ্জ্বল সন্ধ্যাতারা দেখতে দেখতে মনে হত অনন্তকাল ধরে এই রাস্তার বুকে হেঁটে যাই আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে। মনে হত ঐ রাস্তা ধরে পাশাপাশি উড়ে চলা দুটো হাঁসের পালকের মতো ভেসে চলি তুমি আমি। মনে হত দুই এক মাইল রাস্তা হাজার হাজার ক্রোশ হয়ে যাক, এক আধঘন্টা সময় হয়ে যাক অসীম, কভু ফুরিয়ে না যাওয়া সময়।

যে রাস্তাকে একসময় মনে হত অতি দীর্ঘ, সেই রাস্তাই হয়ে উঠল ভীষনরকম হ্রস্ব। সময় বয়ে যেত এক দূরন্ত বেগে ছুটে চলা ঝড়ের মতো। তার গতিরোধ করে যদি তাকে শরতের আকাশে কচ্ছপের মতো এগিয়ে যাওয়া পেঁজা তুলোর মেঘ করে দিতে পারতাম, আরো আরো আরো সহস্র লক্ষ শব্দ বিনিময় হত তোমার আমার মধ্যে। ঐ রাস্তা ফুরিয়ে গেলেই যেন মনে হত তুমি ফুরিয়ে গেলে নিকশ কালো অন্ধকার ঘরকে কয়েক মুহুর্ত আলোয় ভরে তোলা সরষে তেলের প্রদীপের ন্যায়।

সংকীর্ণ এক রাস্তা ধীরে ধীরে আমার জীবনের রাজপথ হয়ে উঠল। আমি এখন ঐ রাস্তায় খুঁজি আমার পায়ের ছাপগুলোকে যারা তোমার স্মৃতি বয়ে নিয়ে গেছে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত। আমি চোখে চোখ রাখি ঐ সন্ধ্যাতারার যে প্রতিদিন সাক্ষী থেকেছে কীভাবে এক চুম্বকের মতো তোমার আকর্ষনে ছুটে এসেছি ঐ রাস্তার বুকে, কীভাবে রাত্রির অন্ধকার ছিন্ন করে তোমার আলোয় স্পষ্ট হয়েছে ঐ রাস্তার দিশা। মাথার উপরের আকাশে সেই নক্ষত্রগুলোকে খুঁজি যারা তোমার থেকে আলো এনে আমার জীবনের বিভিন্ন দিক জ্যোতির্ময় করেছে।

কালো অতি সাধারন এক রাস্তার দিকে তাকালে এখন আমি হারিয়ে যাই তোমার আমার মধ্যে হয়ে চলা কথার ভিড়ে। যে কথা আজও ফুরায়নি, এ কথা শেষ নিঃশ্বাসের আগে ফুরাবে না। তাই অদেখার প্রতিটি মুহুর্তে প্রতি দিন হাজার ব্যস্ততার মাঝেও তুমি এসে হাজির হও আমার মনের ঘরে। এই মনবাড়ি থেকে যেও না তুমি, যেতে দেবো না তোমায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *