তুমি আমার থেকে দূরে যাওয়ার পর আমি কান্নার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে ফেলেছি। আমার চোখের জলে আমার গাল ধুয়ে শীতের শুষ্কতা দূর হয়ে গেছে। শুধু চোখ নয়, শুষ্ক এই পৌষে আমার মনও ভিজে আর্দ্র হয়ে আছে। তোমার দূরে যাওয়ার দিনে, সবাই দেখেছে আমি পাগলের মতো কাঁদছি একটি মেয়ের জন্য – তোমার জন্য। তুমিও কেঁদেছো অঝোরে। সবাই দেখেছে – তুমি উঠে এসে সবার সামনে আমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়েছো। কোনো হিসাব সেদিন করিনি দুজনে। সবাই ভেবেছে নিশ্চয়ই, কেন কাঁদছে এমন করে? এত কেন কাঁদছে?
সৌভাগ্যের কাছে চেয়ে তো তোমায় কাছে রাখতে পারলাম না, তাই দূর্ভাগ্যের কাছে অনুক্ষন প্রার্থনা করছিলাম, কোথাও ছোট্ট অলৌকিকতার আশীর্বাদে একবার দেখা হোক তোমার-আমার। তোমার শহরে এসে রাস্তায়, ভিড়ে, দোকানে খুঁজছিলাম – যদি কোথাও একবার দেখতে পাই তোমায়। সৌভাগ্য আমার কথা শোনেনি, কিন্তু দূর্ভাগ্য তোমায় দূরে নিয়ে গেলেও আমার চোখের জলের প্রার্থনা উপেক্ষা করেনি। হঠাৎ পেয়ে গেলাম আমার চিরন্তনার দেখা!
বাঁক ঘুরেই আমার হৃদয়ে সেই অনুরনন। সেই ছন্দোবদ্ধ তোমার হেঁটে আসা, সেই চোখের দৃষ্টি, সেই মায়াভরা মুখ। কয়েক সেকেন্ড আমি যেন এক নির্বাক দর্শক! ভাবতে পারিনি অস্তগত সন্ধ্যাতারার আকাশের নীচে, শহরের সদ্যপ্রস্ফুটিত রোশনির আভায় তোমায় পাবো আমি! দুজনে কিছুক্ষন কিছু বলতেই পারিনি, শুধু চেয়েই থেকেছি – মনে পড়ছে তোমার?
– “তোমার শরীর খারাপ? গলাটা যেন কেমন ধরা লাগছে!”
– “খুব ঠান্ডা লেগেছে। কী অবস্থা করেছো তুমি তোমার চেহারার!”
আর চোখের জল কথা শোনেনি। জানো, আমার চোখের জল বড়ো অবাধ্য। তুমি কাঁদতে মানা করো, আমি ওকে তোমার সেই নিষেধ পৌঁছে দিই, তাও ও আমার কথা শোনে না। ওর কী দোষ বলো! ও আসলে এক রক্তঝরা হৃদয়ের কথা শোনে। তাই তোমার দিকে চেয়ে আবার ভিজে গেল আমার দুই চোখ। শুধু আমার! তুমিও যে কাঁদছিলে চিরন্তনা! খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার, আমায় ছেড়ে? নাকি, তোমার বিরহে আমার জীর্ন হয়ে যাওয়া শরীর দেখে, আমার শীর্ন মুখ দেখে কষ্ট হচ্ছে! তুমিও দেখোনি, আমিও দেখিনি – আমাদের আর কেউ দেখছে কিনা।
তুমি এগিয়ে এসে আমার হাত ধরলে। কতদিন ঐ হাতের স্পর্শ পাইনি। অথচ দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ঐ স্পর্শে কম্পিত হয়েছি আমি, হৃদয় গলে গেছে! হাতদুটো বুকে ধরে রেখেছি, চুম্বন করেছি, ছাড়তে ইচ্ছা করেনি কখনো। কত ভালোবাসা তোমার! নইলে এভাবে জনারন্যে আমার হাত ধরতে পারো? তোমার সঙ্গে আমার এই হঠাৎ দেখা ভীষন স্মৃতিময় হয়ে থাকল।
তোমার কাছ থেকে আসতে ইচ্ছা করছিল না। আমার কখনো তোমার থেকে ফিরে যেতে ইচ্ছা করেনি। আমি তোমার সঙ্গে মন্ত্রপড়া বশীভূত হয়ে কথা বলেছি বছরের পর বছর। আমি তোমায় দেখার জন্য চাতকের মতো অপেক্ষা করেছি প্রতিদিন। আমার কি তোমার কাছ থেকে ফিরে আসতে ইচ্ছা করে গো? তাহলে দূরে হারিয়ে এত কেঁদেছি কেন উন্মাদের মতো? তবু ফিরে যেতে হল, ফিরলাম দুজনে পাশাপাশি, সেই আগের মতো, দুজন দুজনকে শুভেচ্ছা জানিয়ে। ফিরে ফিরে দেখছিলাম তোমায়, তুমি আমাকে। বুকে ব্যথা হচ্ছিল তোমায় ফেলে আসতে পথের বাঁকে।
ভীষনভাবে তোমায় বুকে জড়িয়ে ধরতে না পারাটাকে ফেলে এলাম পথের মাঝে।
আবার কোনো এক পথের বাঁকে তোমার সাথে মিলব আমি, সেই অপেক্ষা শুরু হল। তুমি আমি তো “মিরাকল” চাই। ঈশ্বর কি আজ তারই ক্ষুদ্র নিশানা দিয়ে রাখলেন? নইলে আগে কখনো এভাবে দেখা হয়নি তো? আমি তো ভীষন চাইছিলাম, একবার দেখি তোমায়। তুমিও কি চেয়েছিলে মন থেকে?