একটি ভালোবাসার ইস্তেহার

শাড়ি পড়ে ও ছোট্ট টিপ পরে যখন তুমি প্রথম এসেছিলে তোমার কাজে, সেখানে আমিও ছিলাম। তোমায় চিনতাম না, তবু মাত্র কয়েকদিনেই তোমার মধ্যে খুব চেনা এক বান্ধবীকে দেখেছিলাম। একদিন “আপনি” বলেছিলে, পরেরদিনই “তুমি” বলেছিলে, খুবই সাধারন পরিচয়ের হিসেবে। পাটগাছের আঁশগুলোও জানে না, তাদের দিয়ে ভবিষ্যতে এমন শক্ত রশি তৈরি হবে, যাকে ছিড়েঁ ফেলা দূরুহতম কাজগুলির একটা। যে তন্তুগুলো নিজেদের চিনতই না, তারাই পরস্পরের সঙ্গে এমন বন্ধনে জড়িয়ে যায়, তাদের দূরে সরালে এমন কষ্ট হয় যে তারা কারো রক্তক্ষরণও ঘটিয়ে দেয়।

তেমনি করেই তোমার আমার সম্পূর্ন অচেনা থেকে পরম চেনা হয়ে ওঠা। বন্ধুত্ব থেকে প্রেমডোরে বেঁধে ফেলেছি তোমায়। তুমি চাওনি, প্রথমে তুমি ছিটকে যেতে চেয়েছো, প্রথমে তুমি সমাজের শৃঙ্খলের আঘাত পেয়ে নামিয়ে দিতে চেয়েছো আমায় বারবার তোমার ভালোবাসার সিংহাসন থেকে। কিন্তু ধীরে ধীরে সমস্ত ঝড় অসীম সহ্যক্ষমতার বুকে নিয়ে ভালোবেসেছ আমায়। যখন ভালোবেসেছ, কেউ পারেনি তোমায় আমায় বিচ্ছিন্ন করতে। আজ বলেছো, তুমি সরে থাকো। আগামীকাল বুকে টেনে নিয়েছ ভীষন জোর দিয়ে। তীব্র অপমান, যন্ত্রনা, তুফান সহ্য করে নিয়েছি, তুমি নিয়েছ, কখনো দাওনি একেবারে ছুড়ে ফেলে আমায়।

আমি জানতাম বিধাতার খাতার কোন পাতায় তোমায় আমার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরোয়ানা লেখা আছে। তাই প্রতিদিন যন্ত্রনায় বিদ্ধ হয়েছি সেই পরোয়ানার  কার্যকর হওয়ার দিনের কথা ভেবে, তোমায় আমার কাছ থেকে হারিয়ে ফেলার কষ্টে। আমি জানতাম, তোমার শূন্যতায় আমার রক্তশূন্যতা হবে। আমি জানতাম, তোমায় না দেখার অশ্রুনদীর বন্যার ধাক্কায় আমার চোখ অন্ধ হবে। আমি জানতাম, তোমার সাথে কথা না বলতে পারার নিস্তব্ধতায় আমি মূক হয়ে যাবো। আমি জানতাম, তোমার অভাবে আমার অন্তরের হাহাকারের আর্তনাদে আমি বধির হয়ে যাবো। তুমি ছাড়া আমি পঙ্গু হয়ে যাবো, আমি জানতাম। তাই তোমায় মাত্র একদিন দেখতে না পেয়ে কেঁদেছি, তাই তোমার কাছ থেকে যাওয়ার কয়েক ঘন্টা পরেই তোমার কাছে আবার ফিরে আসার তীব্র আকুতি তৈরি হয়েছে আমার ভিতরে। কেন, এবার বুঝেছো তুমি, চিরন্তনা !

তোমায় হারিয়ে এখনো নতুন করে তোমায় খুঁজে পাইনি। আমি এখনো তোমায় হাহাকার করে খুঁজছি এই প্রাঙ্গনে, এই দিওয়ারে, এই ঘাসে। আমার চারপাশের বাতাসে তোমার কন্ঠস্বর খুঁজছি, সূর্যের আলোয় তোমার ছায়া খুঁজছি, অন্ধকারে তোমার মনের আলো খুঁজছি। তোমার হাতদুটো আমার হাতে নিয়ে পরম ভালোবাসায় চুম্বন করেছি, আমি আমার নিঃস্ব হাতে তার স্পর্শ খুঁজছি। তোমার দুই চোখ ভুলতে পারি না। কত ভালোবাসা, অভিমান, যন্ত্রনা ঐ কালো তারাদুটোয়। এখানে, আমাদের ভালোবাসার এই উদ্যানে যেখানে বসে তুমি আমি একযুগ ধরে সহস্র স্মৃতি রচনা করেছি, সেই উদ্যান তোমার বিহনে শ্মশানে পরিনত হয়েছে। অন্তত আমার কাছে, কারন পৃথিবীর কর্মযজ্ঞে কোথাও কোনো বিরতি নেই।

তোমার চলে যাওয়ার বিষন্ন দিনে দুজনে শিশুর মতো কেঁদেছি। গোটা দুনিয়া কেঁদেছে এক পরম সম্পদ দূরে চলে যাওয়ায়। সেই বিদায়বেলায় তুমি আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছি নিজেদের –

এই ভালোবাসা চিরন্তন। দূরত্ব আর নৈকট্যের সঙ্গে এর বিচ্ছেদের কোনো সম্পর্ক নেই।

যেদিন জানবে ভালোবাসি না, সেদিন জানবে মরে গেছি।

দূরে থেকেই দুজন দুজনের মনের খবর রাখব।

তুমি নেই আজ আমার কাছে। আমি এক নির্বাক, নির্জন পৃথিবীর একক বাসিন্দা হয়ে গেছি। তুমি আজ আমায় ছাড়া আছো, এক ভিড়ের মধ্যে আছো। লাগছে আমায় ছাড়া একা? খুঁজছ আমায়?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *